রোজা ও অটোফেজি - Slogaan BD

Breaking

Post Top Ad

Post Top Ad

রোজা ও অটোফেজি

চিকিৎসা বিজ্ঞানের জনক হিপোক্রেটিস বলেছেন, আমাদের প্রত্যেকের শরীরের মধ্যেই একজন ডাক্তার বসবাস করেন, আমাদের উচিত সেই ডাক্তারকে কাজ করতে দেয়া। এটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া। তিনি আরো বলেছেন, খাবারই হওয়া উচিত আমাদের ওষুধ, ওষুধই হওয়া উচিত আমাদের খাবার। কিন্তু আমরা যখন অসুস্থ হই তখন যদি আমরা খাবার গ্রহণ করি, তা প্রকারান্তরে সেই অসুস্থতাকেই খাবার জোগান দেয়া। শরীরের ডাক্তারকে কাজ করতে দেয়ার জন্য প্রয়োজন উপবাস, উপবাস করলেই শরীরের সেই ডাক্তার কাজ করতে পারে। এ বিষয়ে বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন বলেছেন, সবচেয়ে ভালো ওষুধ হচ্ছে উপবাস এবং বিশ্রাম।

সবিরাম উপবাস বা ইন্টারমিটেন্ট ফ্যাস্টিং প্রসঙ্গে আলোকপাত করার আগে আরো একটা বিষয়ে জানা ভালো, সেটি হচ্ছে ফ্যাস্টিং এবং স্টারভেশন কিন্তু এক নয়। স্টারভেশন মানে অপরিকল্পিত অনাহার যাতে অপুষ্টির ঝুঁকি থাকে। সবিরাম উপবাস বা ইন্টারমিটেন্ট ফ্যাস্টিং একটি পরিকল্পিত উপবাস, এর একটা নির্দিষ্ট ডিজাইন থাকে, নিয়ম থাকে তা সে যেমনই হোক। রোজা তেমনই এক ধরনের উপবাস যা ধর্মীয় অনুশাসনের কারণে মুসলমানরা করে থাকেন। অন্যান্য ধর্মেও নানা ধরনের উপবাসের প্রচলন আছে। 

প্রতিনিয়ত আমাদের শরীরের বিভিন্ন কোষ মরে যায়, মৃত এই কোষগুলো কোষের অভ্যন্তরে লাইসোজোম নামের একটি বিশেষ কোষাঙ্গে জমা হতে থাকে। একইভাবে শরীরের মধ্যে মৃত ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাসও জমা থাকে লাইসোজোমে। বলা যেতে পারে লাইসোজোম হচ্ছে কোষের রিসাইকেল গার্বেজ বিন। কিন্তু শরীর যখন কোনো চাপের মুখে পড়ে তখন রিসাইকেল গার্বেজ বিনে সঞ্চিত মৃতকোষগুলো থেকে শরীর শক্তি এবং নতুন কোষ তৈরি করে। যার ফলে শরীরের বর্জ্য ব্যবহৃত হয়ে শরীরকে করে দূষণমুক্ত। শরীরের এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় অটোফেজি, যার অর্থ হলো সেল্ফ ইটিং বা আত্মভক্ষণ। অটোফেজি প্রক্রিয়ার এই বিষয়টি আবিষ্কারের জন্য চিকিৎসা বিজ্ঞানে ২০১৬ সালে নোবেল প্রাইজ পেয়েছেন জাপানের ডা. ইয়োসনারি উসোমি। তারপর থেকেই বিষয়টি নিয়ে শুরু হয় ব্যাপক আলোচনা। শরীর সুস্থ রাখার জন্য অটোফেজি খুবই দরকারি একটি বিষয়৷ অটোফেজি হচ্ছে শরীরকে প্রাকৃতিকভাবে দূষণমুক্ত করার পদ্ধতি। কোনো কারণে এই অটোফেজি প্রক্রিয়া ব্যাহত হলে শরীরে বিষাক্ত পদার্থের পরিমান বেড়ে গিয়ে তা টাইপ-টু ডায়াবেটিস ও ক্যানসারের সৃষ্টি করতে পারে। এছাড়াও অটোফেজি প্রক্রিয়ায় শরীরে তৈরি হয় নাইট্রিক অক্সাইড। এই নাইট্রিক অক্সাইড দেহকোষকে পুনরুজ্জীবিত করে বাড়িয়ে দেয় কোষের আয়ু যা এন্টি এজিং বা বার্ধক্য রোধক হিসাবে কাজ করে। কোষ পুনরুজ্জীবনের ইতিবাচক প্রভাব পুরো শরীরের ওপরই পড়ে যা অন্য অঙ্গের উপকারে আসে।


তার মানে হচ্ছে অটোফেজি শরীরকে ভাঙ্গে না বরং শরীর গড়ে। আর অটোফেজির এই পদ্ধতি চালু হতে প্রয়োজন কিছুটা দীর্ঘ সবিরাম উপবাস। রোজাও এক ধরনের সবিরাম উপবাস। ১০-১২ ঘণ্টার উপবাসে শরীরে অটোফেজি প্রক্রিয়া চালু হয়, রোজা রাখলেও এই শারীরিক সুবিধা পাওয়া যায়। তবে এসব কিছুই সুস্থ ব্যক্তির সুস্থতার জন্য। কিছু কিছু অসুস্থতায় সবিরাম উপবাস এবং অনাহার দুটোই ক্ষতিকর হতে পারে। অধিকাংশ নিয়ন্ত্রণযোগ্য রোগের ক্ষেত্রে সবিরাম উপবাস উপকারে আসে। তবে যাদের রোগ নিয়ন্ত্রণে নেই, বিশেষ করে কিডনি রোগ, হার্টের কার্যক্ষমতা আশঙ্কাজনকভাবে কম তাদের জন্য রোজা বা সবিরাম উপবাস প্রযোজ্য নাও হতে পারে। সে বিষয়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবেন। কিন্তু কেউ কেউ আছেন অটোফেজির মতো  বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণার উপকারী দিকগুলো যে রোজার মাধ্যমেও পাওয়া যায় তা ঠিক মানতে চান না। তাদের বক্তব্য হচ্ছে, গবেষণা রোজা নিয়ে হয় নি, হয়েছে ফাস্টিং নিয়ে। একইভাবে অন্য একটি দল আছেন যারা রোজার উপকারের কথা বলতে গিয়ে, ফাস্টিং নিয়ে যে কোনো বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণার ফলকেই পবিত্র কোরানে আগেই সে বিষয়ে বলা আছে বলে বক্তব্য দিয়ে থাকেন। কথা হচ্ছে- কোরানে সরাসরি অটোফেজির উল্লেখ না থাকলেও রোজা রাখার মাধ্যমে শরীর অটোফেজির সুবিধা পাবে না- তা যেমন সম্ভব নয়, তেমনি কোনো গবেষণার সঙ্গে রোজার সম্পৃক্ততা পেলেই সেই গবেষণা অসার হয়ে যায় না।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Blogger দ্বারা পরিচালিত.

Post Top Ad

{SCOpenGraph image=http://site.com/link-to-homepage-image.jpg}