পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে ভাষা ও সংস্কৃতি নিয়ে কাজ করছে সুইজারল্যান্ডভিত্তিক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান এডুকেশনফার্স্ট (ইএফ)। ১১৬টি দেশে কার্যক্রম পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানটি ২০১১ সাল থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের জনগোষ্ঠীরইংরেজি দক্ষতা বিষয়ে সূচক প্রকাশ করে আসছে। চলতি বছরের সূচকটি এ মাসেই প্রকাশ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। প্রথমভাষা ইংরেজি নয় এমন ১০০টি দেশের ২৩ লাখ মানুষের ওপর জরিপ চালিয়ে ইংরেজি দক্ষতা পরিমাপ করেছে তারা।প্রাপ্ত স্কোরের ভিত্তিতে দেশগুলোকে অতি উচ্চ, উচ্চ, মধ্যম, নিম্ন ও খুবই নিম্ন দক্ষ—এ পাঁচ স্তরে ভাগ করা হয়েছে। ৪৮দশমিক ১১ স্কোর নিয়ে বাংলাদেশ রয়েছে তালিকার একাত্তরতম স্থানে, দক্ষতার শ্রেণী হিসেবে যা খুবই নিম্ন।
শিক্ষাবিদরা বলছেন, প্রাথমিক স্তর থেকেই দেশের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ইংরেজিভীতি তৈরি হচ্ছে। মানসম্মত শিক্ষকেরঅভাব ও দুর্বল পাঠক্রমের কারণে পরবর্তী ধাপগুলোতে এ দুর্বলতা আর কাটিয়ে উঠতে পারছে না শিক্ষার্থীরা।ইংরেজিতে দুর্বলতা নিয়েই শিক্ষাজীবন শেষ করছে তারা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ইমিরেটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, আমাদেরদেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যারা ইংরেজিতে পাঠদান করছেন, তাদের ইংরেজিতে দক্ষতা কোন পর্যায়ে রয়েছে, সেটিদেখতে হবে। শিক্ষকরাই যদি দুর্বল হন, তারা শিক্ষার্থীদের কী শেখাবেন? একদিকে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের অভাব, অন্যদিকে নিয়োগ পাওয়ার পরও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা না করার ফলে পরিস্থিতির পরিবর্তন হচ্ছে না।
কমিউনিকেটিভ পদ্ধতিতে ইংরেজি শিক্ষাদান পদ্ধতিকে ভুল উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমরা ইংরেজি শিখেছি গল্প, কবিতা পড়ে। এখন পাঠ্যবইয়ে গল্প, কবিতা রাখা হয়েছে খুবই কম। ফলে ইংরেজি অনেক কঠিন একটা ভাষা—এধরনের মনোভাব শিক্ষার্থীদের মধ্যে তৈরি হচ্ছে, যা পরবর্তী সময়ে তাদের এ বিষয়ে দক্ষতা অর্জনে প্রতিবন্ধক হিসেবেকাজ করছে।
সামাজিক পরিস্থিতির বর্ণনায় সূক্ষ্ম ও যথাযথ ভাষারপ্রয়োগ, উচ্চমার্গীয় ইংরেজি রচনা সহজে পড়তে পারাএবং ইংরেজি ভাষা ব্যবহারকারী দেশের স্থানীয়বাসিন্দাদের সঙ্গে চুক্তিতে দরকষাকষির সক্ষমতা থাকলেতাকে অতি উচ্চস্তরের দক্ষতা হিসেবে বিবেচনায় নিয়েছেইএফ। প্রধান ভাষা ইংরেজি নয়, এমন দেশগুলোর মধ্যে এশ্রেণীতে প্রথম দিকে আছে নেদারল্যান্ডস, সিঙ্গাপুর ওসুইডেন।
ইংরেজিতে কর্মস্থলে প্রেজেন্টেশন দেয়া, টিভি শো বুঝতেপারা ও পত্রিকা পড়তে পারাকে উচ্চদক্ষতা হিসেবেসংজ্ঞায়িত করেছে ইএফ। দক্ষতার এ শ্রেণীতে থাকাদেশগুলোর মধ্যে অন্যতম হাঙ্গেরি, দক্ষিণ কোরিয়া ওফিলিপাইন।
ব্যক্তিগত দক্ষতার ক্ষেত্রসংশ্লিষ্ট বৈঠকে অংশগ্রহণ, ইংরেজিগানের কথা বুঝতে পারা ও পরিচিত বিষয়সংশ্লিষ্ট পেশাদারই-মেইল লেখার সক্ষমতাকে মধ্যম মানের দক্ষতা হিসেবেচিহ্নিত করেছে প্রতিষ্ঠানটি। এ শ্রেণীতে যেসব দেশ আছেতাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো চীন, কোস্টারিকা, ফ্রান্স ওভারত।
পর্যটক হিসেবে ইংরেজি ভাষাভাষী কোনো দেশে সঠিকভাবে পথ চলাচল, সহকর্মীদের সঙ্গে ছোট ছোট আলোচনায়সম্পৃক্ত হওয়া ও ইংরেজিতে পাঠানো সহকর্মীদের সাধারণ ই-মেইল বুঝতে পারলে তাকে নিম্ন দক্ষতা হিসেবে উল্লেখকরা হয়েছে। এ শ্রেণীর দেশগুলোর মধ্যে আছে বলিভিয়া, পাকিস্তান, রাশিয়া, জাপান ও নেপাল।
আর সাধারণভাবে ইংরেজিতে নিজের পরিচিতি (নাম, বয়স, দেশ ইত্যাদি) তুলে ধরা, সাধারণ চিহ্নগুলো বুঝতে পারাও বিদেশী অতিথিকে সাধারণ পথনির্দেশনা দেয়ার সক্ষমতাকে অতি নিম্ন স্তরের দক্ষতা হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছেইএফ। ইংরেজিতে দক্ষতার এ শ্রেণীতে যেসব দেশ আছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো বাংলাদেশ, মালদ্বীপ ও সংযুক্তআরব আমিরাত (ইউএই)।
ইংরেজি প্রধান ভাষা নয় এমন ১০০টি দেশের মধ্যে ৪৮ দশমিক ১১ স্কোর পেয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ৭১তম।যেখানে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত বাংলাদেশ থেকে দুই স্তর উপরে মধ্যম মানে রয়েছে। তালিকায় ৩৪তম অবস্থানে থাকাভারতের স্কোর ৫৫ দশমিক ৪৯। তালিকায় বাংলাদেশের চেয়ে চার ধাপ এগিয়ে ৬৬তম অবস্থানে রয়েছে নেপাল। নিম্নস্তরে থাকা দেশটির স্কোর ৪৯। এবারের সূচকে স্কোরে আগের চেয়ে পিছিয়েছে বাংলাদেশ। ২০১৮ সালের সূচকেবাংলাদেশের স্কোর ছিল ৪৮ দশমিক ৭২।
শহরভিত্তিক ইংরেজি দক্ষতার সূচকও প্রকাশ করেছে ইএফ। সেখানে দেখা যায়, জাতীয় অবস্থানের তুলনায় রাজধানীঢাকার অবস্থান তুলনামূলক ভালো। ৪৮ দশমিক ৬৭ স্কোর নিয়ে রাজধানী ঢাকা রয়েছে নিম্ন অবস্থানে।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন